![]() |
| ছবিঃ Getty Image |
কুর্দি জাতির উৎপত্তি ও ইতিহাস
কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী,
যাদের বসবাস মূলত ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে। আজকের দিনে এই
ভৌগোলিক অঞ্চলকে বলা হয় কুর্দিস্তান—যদিও এটি
কোনো স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি কুর্দি মানুষ নিজেদের
মাতৃভূমি কুর্দিস্তান বলে উল্লেখ করলেও তারা ছড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও
আমেরিকার বিভিন্ন প্রবাসী সমাজে।
কুর্দিদের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
ঐতিহাসিকরা মনে করেন, তারা প্রাচীন মিডিয়ান সাম্রাজ্যের বংশধর, যেটি খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে ইরানের উত্তর-পশ্চিমে শক্তিশালী
ছিল। ‘কুর্দ’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ মেলে আরবি ও পারস্যের ঐতিহাসিক গ্রন্থে, যেখানে
পাহাড়ি অঞ্চলের যোদ্ধা ও পশুপালনকারী জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের বর্ণনা করা হয়েছে।
মধ্যযুগে কুর্দিরা ইসলামী খেলাফতের সামরিক শক্তি ও
প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি সালাহউদ্দিন আইউবি (সালাদিন) ছিলেন কুর্দি বংশোদ্ভূত, যিনি ক্রুসেডের বিরুদ্ধে
জেরুজালেম রক্ষা করেছিলেন।
আধুনিক ইতিহাসে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান
সাম্রাজ্যের পতনের পর কুর্দিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আশা দেখা দিলেও, সেভরেস
চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় তা পূর্ণ হয়নি। বরং কুর্দিস্তান ভৌগোলিকভাবে চারটি
রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়—তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়া। এর ফলে কুর্দিরা আজও
রাষ্ট্রহীন বৃহত্তম জাতি হিসেবে পরিচিত।
![]() |
| একজন কুর্দি নারীর ছবি |
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি
কুর্দি সংস্কৃতি পাহাড়ি জীবন, মৌসুমি উৎসব এবং
লোকসঙ্গীতে সমৃদ্ধ। তাদের মধ্যে প্রধান সামাজিক বন্ধন হলো গোত্র বা উপজাতি। কুর্দি ঐতিহ্যে পারিবারিক একতা,
বীরত্বগাথা ও আতিথেয়তা বিশেষভাবে মূল্যবান।
- ভাষা: কুর্দি ভাষার কয়েকটি উপভাষা রয়েছে—কুরমানজি, সোরানি ও
জাজাকি। যদিও অঞ্চলভেদে পার্থক্য আছে, তবু কুর্দি সাহিত্য, কবিতা ও মৌখিক
ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। - সঙ্গীত
ও নৃত্য: দফ (ডফ) নামের
বাদ্যযন্ত্র, বীরত্বপূর্ণ লোকগীতি এবং গভন্দ নামে পরিচিত বৃত্তাকার লোকনৃত্য কুর্দি সংস্কৃতির মূল
আকর্ষণ। - উৎসব: কুর্দিদের প্রধান উৎসব হলো নওরোজ (২১ মার্চ), যা বসন্ত ও নতুন বছরের সূচনা হিসেবে পালিত
হয়। আগুন জ্বালিয়ে নাচ, গান ও ভোজন উৎসবের অংশ।
সামাজিক জীবন ও ধর্মবিশ্বাস
কুর্দিদের সামাজিক জীবন মূলত গোত্রভিত্তিক। তাদের
মধ্যে গ্রামের প্রতি একধরনের আত্মিক টান ও পারিবারিক সম্পর্ক গভীর।
ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে অধিকাংশ কুর্দি সুন্নি মুসলিম (শাফেয়ী মাজহাব) হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া কুর্দি রয়েছে। এছাড়া কিছু প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস এখনো টিকে আছে, যেমন—
- ইয়াজিদি
ধর্ম: সূর্যপূজা ও প্রাচীন মেসোপটেমীয় বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত এক
স্বতন্ত্র ধর্ম। - আলেভি
ও জরথুস্ত্রী প্রভাব: বিশেষত তুরস্ক ও ইরানের কিছু অঞ্চলে। - এছাড়া
খ্রিস্টান ও ইহুদি কুর্দি সম্প্রদায়ও ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে,
যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম।
রাজনৈতিক সংগ্রাম ও বর্তমান অবস্থা
রাষ্ট্রহীন হওয়ায় কুর্দিদের দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক
সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। ইরাকে ১৯৯১ সালের পর থেকে কুর্দি স্বায়ত্তশাসন গড়ে ওঠে, যা
আজ ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার (KRG) নামে পরিচিত। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল রোজাভা বিশ্বরাজনীতিতে আলোচিত
হয়েছে।
তবে তুরস্ক ও ইরানে কুর্দি আন্দোলন কঠোর দমননীতির
মুখে পড়েছে। কুর্দি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সাংস্কৃতিক অধিকার আজও একটি জটিল
আন্তর্জাতিক প্রশ্ন।
উপসংহার
কুর্দিরা ইতিহাসের বিচারে প্রাচীন ও সমৃদ্ধ
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা আজও রাষ্ট্রহীন। তাদের গান,
নাচ, ভাষা ও ধর্মবিশ্বাস মধ্যপ্রাচ্যের বহুসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কুর্দিদের
পরিচয় তাই কেবল একটি জাতিগত গোষ্ঠী নয়, বরং এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন,
যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন এখনো অসম্পূর্ণ।










Leave a Reply